যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানে ইরানের ৭ দফা শর্ত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ অবসানে আলোচনার অগ্রগতির জন্য সুনির্দিষ্ট সাতটি শর্ত বা দাবি উত্থাপন করেছে ইরান। দেশটির শীর্ষস্থানীয় সংসদীয় নেতা এবং শীর্ষ আলোচকদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যেকোনো ধরনের অর্থবহ সমঝোতা বা শান্তি আলোচনায় পৌঁছাতে হলে তেহরানের এই সাতটি শর্ত অবশ্যই মেনে নিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং কাতার ও পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা চলার প্রেক্ষাপটে এই শর্তগুলো সামনে এসেছে।
ইরানের প্রধান শর্তগুলোর মূল বিষয়বস্তু
১. লেবাননসহ সামরিক সংঘাতের পূর্ণ অবসান
ইরানের মতে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের ইতি টানতে হলে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। এই দাবিতে ইরান স্পষ্টভাবে লেবাননের নাম উল্লেখ করেছে এবং গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধেরও বারবার আহ্বান জানিয়েছে (যদিও সাম্প্রতিক সময়ের ঘোষণায় গাজার কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি)।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল এবং ইরানের প্রধান মিত্র হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই থামানোর জন্য বারবার চেষ্টা চালিয়েছে। জুনে তারা একটি ত্রিপক্ষীয় (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-লেবানন) ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির মাধ্যমে মধ্যস্থতা করে। হিজবুল্লাহর অস্ত্রসংবরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং লেবাননের সেনাবাহিনীর মোতায়েনের রূপরেখা সংবলিত এই অন্তর্বর্তী চুক্তির পর ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হয়। এই চুক্তির ফলে সাময়িক বিরতি এলেও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি।
২. নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার
সংঘাত শুরুর পর হরমুজ প্রণালী এবং এর আশেপাশের জলসীমা এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংবেদনশীল পয়েন্ট হয়ে ওঠে। ২৮ ফেব্রুয়ারির মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর ইরান এই আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে সীমিত করে দেয়, যা রেকর্ড পরিমাণে কমে যায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
এই ব্যাহত পরিস্থিতির কারণে হাজার হাজার নাবিকের সুরক্ষাও হুমকির মুখে পড়ে। তারা মাসের পর মাস সমুদ্রে আটকে থাকেন এবং খাদ্যাভাব ও সামরিক হামলার দ্বিমুখী ঝুঁকিতে পড়েন।
২৮ ফেব্রুয়ারির এক মাসেরও বেশি সময় পর যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে আলোচনা ব্যর্থ হলে, ১৩ এপ্রিল থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশকারী এবং বের হওয়া সব জলযানের ওপর অবরোধ শুরু করে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, অন ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজ চলাচলে বাধা দেবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যেসব দেশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের জন্য ইরানকে শুল্ক দেবে তাদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হবে, কারণ তেহরানের আন্তর্জাতিক জলপথ সীমিত করে লাভবান হওয়া উচিত নয়।
জুনে যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর মার্কিন নৌ-অবরোধ সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তবে ট্যংকার জাহাজে ইরানের নতুন হামলার পর ১৫ জুলাই তা পুনরায় বহাল করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের “ইরানের অর্থনীতিকে সংকুচিত করা” কৌশলের অংশ হিসেবে এই অবরোধ বহাল রয়েছে।
৩. ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
তেহরানের জন্য দশকের পর দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ থেকে মুক্তি পাওয়াটা যেকোনো সম্ভাব্য সমঝোতার মূল শর্ত, যা যুদ্ধবিরতির পর আলাদাভাবে আলোচনা করার মতো বিষয় নয়।
বিশ্বের যেসব দেশের ওপর সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, ইরান তার অন্যতম। দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং জাতিসংঘের একাধিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন।
এই নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু হয়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিভিন্ন সময়ে এই নিষেধাজ্ঞা জোরদার ও পুনর্প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়াতে অতিরিক্ত পদক্ষেপ চালু করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা শিথিলে নীতিগতভাবে বিরোধী না হলেও ইরানের সঙ্গে মূল মতপার্থক্য এর পর্যায়ক্রম নিয়ে: যুক্তরাষ্ট্র চায় বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার আগে ইরান পারমাণবিক ছাড় দিক, অন্যদিকে ইরান চায় যুদ্ধ অবসানের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবেই অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হোক।
৪. জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা
বিদেশে আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদের ভবিষ্যৎ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আলোচনায় আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দুই পক্ষ শুধু এই তহবিলে প্রবেশাধিকার নিয়েই একমত হতে পারছে না তা নয়, বিদেশে ইরানের ঠিক কত সম্পদ জব্দ রয়েছে তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সম্পদের পরিসংখ্যান বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিস (ইউএসআইপি) আন্তর্জাতিক হিসাবের বরাতে এটি ১০০ বিলিয়ন থেকে ১২৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে বলে উল্লেখ করেছে।
অন্যান্য পর্যালোচনায় চীন, ইরাক, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং লুক্সেমবার্গসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার আটকে থাকার কথা বলা হয়েছে।
প্রশ্ন কেবল বিপুল পরিমাণ অর্থ জব্দের নয়, বরং কবে এবং কীভাবে তা হস্তান্তর করা হবে তা নিয়েও। ইরানের দাবির মধ্যে রয়েছে চূড়ান্ত আলোচনার আগেই তহবিলের একটি অংশ মুক্ত করা এবং আলোচনা চলাকালীন বাকি অংশ ধাপে ধাপে ছাড় করা।
৫. অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হ্রাস
ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাদের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনুক এবং যুদ্ধ শুরুর আগে ও যুদ্ধের সময় যে বর্ধিত সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল তা প্রত্যাহার করুক। তেহরানের দাবি, বর্ধিত যুদ্ধকালীন সামরিক উপস্থিতিকে স্থায়ী না করে মার্কিন বাহিনীকে যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
আগস্টে প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) সাধারণত জর্ডান থেকে ওমান পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ২০টি সামরিক ঘাঁটিতে প্রায় ৪০,০০০ সেনা বজায় রেখেছিল। এর মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর বড় স্থাপনাসমূহ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা মার্কিন বিমান ও নৌ অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং আঞ্চলিক লজিস্টিকসের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
তবে তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিও বাড়ে। যুদ্ধ শুরুর আগের সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটন অতিরিক্ত বিমানবাহী রণতরী, গাইডেড-মিসাইল ধ্বংসকারী জাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে, যা তাদের সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ায়।
৬. যুদ্ধজনিত ক্ষতির ক্ষতিপূরণ প্রদান
ইরানের যুক্তি, যেকোনো স্থায়ী সমঝোতায় অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং যুদ্ধকালে হওয়া অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর পরিবর্তে তিনি রাস্তায় পুতে রাখা বোমা হামলায় মার্কিন হতাহতের ঘটনা এবং ইরানে বিক্ষোভে নিহতদের জন্য তেহরানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
ধ্বংসলীলার পরিমাপ নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানি সরকারের মুখপাত্র ফাতেমে মহাজেরানি বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তবে তিনি এই পরিসংখ্যানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
৭. ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্র যাতে ইরানের ভূখণ্ডে আর কোনো সামরিক হামলা না চালায়, ইরান সে বিষয়েও নিশ্চয়তা চাইছে। তেহরানের কাছে শুধু যুদ্ধবিরতিই যথেষ্ট নয়; স্থায়ী চুক্তি হতে হলে যুদ্ধ থামার পর পুনরায় হামলার সম্ভাবনাকেও নির্মূল করতে হবে।
১ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর এই দাবিটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ট্রাম্প বলেছিলেন, ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করেছে, তবে এখনও বাকি থাকা এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তু “ব্যবস্থা গ্রহণ” করা প্রয়োজন।
এদিকে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে যেকোনো নতুন হামলা কঠোর জবাবের মুখোমুখি হবে। ৩১ অক্টোবর ইরানের সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি এক লিখিত বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পুনরায় যুদ্ধে না জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করেন।
ইউএই (সংযুক্ত আরব আমিরাত), যা কূটনৈতিক সমাধানের জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছে, তারাও আলোচনার অগ্রগতির আশা প্রকাশের পাশাপাশি সংঘাত বাড়ার পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউএই রাষ্ট্রপতির কূটনৈতিক উপদেষ্টা ড. আনোয়ার গারগাশ মানামায় এক সম্মেলনে বলেন, “আমরা আশা করছি কূটনৈতিক সাফল্য আসবে। পুনরায় আরেকটি যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া এই অঞ্চলের স্বার্থে পড়ে না… তবে আমরা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুত রয়েছি।”
সংঘাত যাতে পুনরায় ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে একটি কাতারি প্রতিনিধি দল তেহরান সফর করার পর, ওয়াশিংটনের সাথে পরোক্ষ আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানও কাতারে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি ও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশের পর ইরানের এই সাত দফা শর্ত যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনাকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

