বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হওয়ার মাস দেড়েক পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলে দিলেন লিওনেল মেসি।
হাতে লেখা নোট ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে সোমবার এই ঘোষণা দেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। গত জুলাইয়ে স্পেনের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে হেরে যাওয়া বিশ্বকাপ ফাইনাল আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল এই মহাতারকার।
পোস্টের শেষে একটি টীকায় মেসি লিখেছেন, “আমি এই কথাগুলো লিখেছিলাম ২১ জুলাই, ফাইনালের দুই দিন পর। আমার বাবার ঘটনার পর, আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।”
মেসির বাবা হোর্হে মেসি গত ৮ অগাস্ট আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরের একটি হাসপাতালে মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।
“ফাইনালের পর যে সময় কেটেছে এবং বিষয়টি নিয়ে অনেক চিন্তা-ভাবনা করার পর, সবাইকে জানাতে চাই যে, আমি আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি…।
“এটা এমন এক সিদ্ধান্ত, যা কষ্ট দিয়েছে এবং এখনও অনেক কষ্ট দেয়, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, সময় এসে গেছে। আপনাদের কাছে শপথ করে বলছি, আমি সবসময় আমার সর্বস্ব দিয়েছি, শুধু এই শেষ কয়েক বছরে নয়, যখন আমরা সবকিছু জিতেছি, তার আগেও; এই জার্সির জন্য আমি সবসময় লড়াই করেছি এবং মাঠে আমার সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি, ফুটবলের মাধ্যমে আপনাদের আনন্দ দিতে এবং আর্জেন্টাইন হিসেবে আপনাদের গর্বিত করতে।”
আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড মেসির, ২০৭ ম্যাচে গোল ১২৫টি। তার কাঁধে ভর করেই ৩৬ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তৃতীয়বারের মতো বিশ্ব সেরার ট্রফি জয় করে আর্জেন্টিনা। দলকে দুটি কোপা আমেরিকা ট্রফিও জেতান তিনি। দলকে তিনবার নিয়ে যান বিশ্বকাপ ফাইনালে।
জাতীয় দলকে দেওয়ার মতো এখন আর কিছু বাকি নেই বলে মনে করেন মেসি। সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রেকর্ড আটবারের ব্যালন দ’র জয়ী।
“সময় ফুরিয়ে আসছে, অধ্যায়গুলো শেষ হয়ে আসছে, আর এটা আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দিচ্ছে। আমি জাতীয় দলের অংশ হতে ভালোবাসি, ভালোবেসেছি এবং সবসময় ভালোবাসব। আমার কিছু ছিল, তার সবকিছুই আমি দিয়েছি; আমার দেওয়ার আর কিছু বাকি নেই। তাছাড়া, কিছু অসাধারণ তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে, যারা এখানে থাকার যোগ্য।
“গত ২০ বছর ধরে আপনাদের দেওয়া সকল ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ। মাঠ থেকে আপনাদের কণ্ঠস্বর শুনতে না পারাটা আমি খুব মিস করব। এখন আমি আপনাদেরই একজন হয়ে থাকব, বাইরে থেকে উৎসাহ দেব এবং সমর্থন করব (ভালো-মন্দ সব সময়ে, বিশেষ করে খারাপ সময়ে)।”
পরিবার, কোচ, সতীর্থদেরও ধন্যবাদ জানান প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে খেলা মেসি।
“সবসময় পাশে থাকার জন্য, এই সুন্দর অথচ কঠিন যাত্রাপথে আমার সঙ্গী হওয়ার জন্য আমার পরিবারকে ধন্যবাদ। প্রত্যেক কোচ, সতীর্থ ও কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ, যাদের সঙ্গে আমি এই পথ পাড়ি দিয়েছি। আমি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি অবিস্মরণীয় সব স্মৃতি আর মুহূর্ত।
“আমি এই মানসিক শান্তি আর গর্ব নিয়ে বিদায় নিচ্ছি যে, আমার সতীর্থদের সঙ্গে মিলে আপনাদের এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছি, যা একসময় আমরা শুধু স্বপ্নই দেখতাম। আপনাদের সবার সঙ্গে এই সময়টা কাটানো ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আপনাদের ভালোবাসি।”
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে মেসির অভিষেক ২০০৫ সালে। গোলের পর গোল আর রেকর্ড করলেও, জাতীয় দলকে কোনো শিরোপা জেতাতে না পারায় একটা সময় তার নেতৃত্ব দেওয়ার সামর্থ্য নিয়ে ছিল অনেক প্রশ্ন। খোদ আর্জেন্টাইনরাই সংশয় প্রকাশ করত তার নেতৃত্ব নিয়ে। শৈশবে স্পেনে চলে যাওয়ায় দেশের প্রতি তার নিবেদন নিয়েও প্রশ্ন উঠত নিয়মিত। এমনও বলা হতো- মেসি বার্সেলোনার, আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাকে মানায় না।
অসাধারণ পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনাকে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে যান মেসি। কিন্তু মারাকানার ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হেরে স্বপ্ন ভাঙে তার ও আর্জেন্টিনার। পরের দুই বছরে দুটি কোপা আমেরিকা ফাইনালেও হারের কারণে অনেকে তাকে জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থ হিসেবেই ভাবত তখন।
২০১৬ কোপা আমেরিকা ফাইনালে হারের পর আচমকাই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলে দেন মেসি, তাও আবার বয়স ৩০ ছোঁয়ার আগেই! কিন্তু পরে ফিরে এসে সব অপূর্ণতাই ঘুচিয়েছেন তিনি।
গত উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়ার (পরে তা ভেঙে দেন কিলিয়ান এমবাপে) পাশাপাশি আর্জেন্টিনাকে আরেকবার ফাইনালে তোলেন মেসি। স্পেনের কাছে হেরে শেষটা হতাশার হলেও, সাফল্যের চূড়ায় থেকেই এই অধ্যায়ের ইতি টানলেন তিনি।
