নেতৃত্বের সংকট, গ্রুপিং নিরসনে আজ প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি চট্টগ্রাম বিএনপির তৃণমূল নেতারা

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ

★ তারেক রহমান চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর চট্টগ্রামের তৃণমূল নেতাকর্মীদের এ ধরনের সাংগঠনিক সভা এবারই প্রথম।

★ চট্টগ্রাম বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের গ্রুপিং ও নেতৃত্বের টানাপোড়েনের মধ্যে দলের চেয়ারম্যানের এই সরাসরি বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) বৃহত্তর চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের সংকট, অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও তৃণমূলের নানা ক্ষোভ-অভিযোগের মধ্যেই আজ ৯ আগস্ট(রোববার) দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মুখোমুখি হচ্ছেন চট্টগ্রাম বিএনপির তৃণমূল নেতৃবৃন্দ। এবার ব্যতিক্রমী উদ্যোগে নগর বিএনপি, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্য এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নগরীর র‌্যাডিসন ব্লুতে সন্ধ্যায় এ সভা অনুষ্ঠিত হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে সাংগঠনিক সভাগুলো ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে জেলা বা মহানগরের সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ‘সুপার ফাইভ’ নেতারা অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু এবার চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে সেই প্রচলিত কাঠামো থেকে বেরিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্যদের সভায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে নেতৃবৃন্দের মধ্যে অসন্তোষ ও মতবিরোধ থাকা তৃণমূল নেতাকর্মীরা সরাসরি দলের প্রধানের সামনে নিজেদের কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপিতে নেতৃত্বের আধিপত্য, গ্রুপিং, কমিটি গঠন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূলের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের দূরত্ব, বিভিন্ন ইউনিটে পদ-পদবি নিয়ে অসন্তোষ এবং নিজেদের পছন্দের বলয়কে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। এসব বিষয়ে দলের চেয়ারম্যানের সরাসরি দিকনির্দেশনা পাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তৃণমূলের নেতারা।

তবে সভায় কারা কীভাবে কথা বলবেন, সে বিষয়টি দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যেই থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে না এনে সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে তৃণমূলকে শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে।

র‌্যাডিসন ব্লুতে অনুষ্ঠেয় সভায় ছয় শতাধিক নেতাকর্মীর অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটির নেতৃবৃন্দ, মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড কমিটির নেতারা এবং উত্তর জেলার উপজেলা পর্যায়ের সিনিয়র নেতারা এতে অংশ নেবেন। পাশাপাশি মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরাও উপস্থিত থাকবেন।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, বিভিন্ন বিভাগে প্রধানমন্ত্রী সফরকালে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসেন এবং সাংগঠনিক সভা করেন। আজ ৯ আগস্ট চট্টগ্রাম সফরেও তিনি সাংগঠনিক সভা করবেন। এতে বিএনপির ছয় শতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেবেন।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের সঙ্গে চট্টগ্রামের তৃণমূল নেতাকর্মীদের এ ধরনের সাংগঠনিক সভা এবারই প্রথম। সাধারণত ঢাকায় অনুষ্ঠিত সভায় ‘সুপার ফাইভ’ নেতারা অংশ নিলেও এবার পুরো কমিটির নেতারা থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে নেতাকর্মীরা চাঙা হবেন এবং সংগঠনকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে।

দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দীন বলেন, সাংগঠনিক সভায় দক্ষিণ জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা অংশ নেবেন। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম চট্টগ্রামের তৃণমূল নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সরাসরি সাংগঠনিক নির্দেশনা শোনার সুযোগ পাবেন।

এদিকে চট্টগ্রাম বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের গ্রুপিং ও নেতৃত্বের টানাপোড়েনের মধ্যে দলের চেয়ারম্যানের এই সরাসরি বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, তৃণমূলের নেতাদের কথা সরাসরি শোনা গেলে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সাংগঠনিক স্থবিরতা ও বিভিন্ন ইউনিটে সমন্বয়হীনতার কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, তারেক রহমান সবসময় তৃণমূলের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছেন এবং তৃণমূলকে মূল্যায়ন করে আসছেন। চট্টগ্রামের তিন সাংগঠনিক ইউনিট ও ১১টি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি সরাসরি কথা বলবেন। নেতাকর্মীরাও তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাবেন। এটিকে তিনি তৃণমূলকে শক্তিশালী করার ধারাবাহিক রাজনৈতিক চর্চা হিসেবে উল্লেখ করেন।

দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এ সভাকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগরজুড়ে সাংগঠনিক সভাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের সাজ সাজ রব পড়ে গেছে।

আজ রোববার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর হেলিকপ্টারে ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শাহ্ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। পরে হাটহাজারী মাদ্রাসায় গিয়ে মরহুম আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী ও আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীর কবর জিয়ারত করবেন। বিকেলে হাটহাজারী কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর সন্ধ্যায় র‌্যাডিসন ব্লুতে বিএনপির সাংগঠনিক সভায় অংশ নেবেন।

রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ সফরকে ঘিরে চট্টগ্রাম বিএনপির তৃণমূল নেতাদের প্রত্যাশাও বেড়েছে। বিশেষ করে নেতৃত্বের সংকট, গ্রুপিং, সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতা এবং তৃণমূলের মূল্যায়ন নিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব কী নির্দেশনা দেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা।

Facebook Comments Box
Share:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *