শিক্ষা অফিসের নির্দেশনা বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে পরীক্ষা ফি আদায়

আজিজুর রহমান, আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল—প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্র কিংবা পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি বাবদ এক টাকাও নেওয়া যাবে না। কিন্তু সেই সরকারি নির্দেশনাকে প্রকাশ্যে অমান্য করে একাধিক বিদ্যালয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।


অভিযোগ উঠেছে, ৫৯ নম্বর ইকড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ২১ নম্বর কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম সাময়িক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে ফি আদায় করা হয়েছে। বিদ্যালয় দুটিতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০ টাকা থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীরা।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টগরবন্দ ইউনিয়নের নদীভাঙনকবলিত ইকড়াইল ও কৃষ্ণপুর এলাকার অধিকাংশ মানুষ নিম্নআয়ের। অনেক পরিবার ঠিকমতো সন্তানদের খাবার ও শিক্ষা উপকরণ জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে। সেই অবস্থায় সরকারি বিদ্যালয়ে পরীক্ষার নামে টাকা নেওয়ায় এলাকাজুড়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
সরেজমিনে কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, তাদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষা ফি নেওয়া হয়েছে।
৫৯ নম্বর ইকড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র মোহাম্মদ মহিবুল্লাহ ইসলাম (রোল-৮) জানায়,“আমার কাছ থেকে ৪০ টাকা নেওয়া হয়েছে।”


একই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল বলেন, “ছোট ক্লাসের ছাত্রদের কাছ থেকে ২০ টাকা আর চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। প্রধান শিক্ষক আশরাফ স্যারের নির্দেশে ফুলমালা ম্যাডাম টাকা নিয়েছেন।”
দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র মুরসালিন জানান, “আমার কাছ থেকে ৩০ টাকা নেওয়া হয়েছে।”
তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র মুস্তাক হোসেন মিরাজ (রোল-৩১) বলে,“আমার কাছ থেকেও ৪০ টাকা পরীক্ষা ফি নেওয়া হয়েছে।”


কৃষ্ণপুর বিদ্যালয়েও একই অভিযোগ,২১ নম্বর কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।
চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতি জানায়,“আমাদের কাছ থেকে ৬০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। পরে দ্বিতীয় দিন পরীক্ষার শেষে টাকা ফেরত দিয়েছে।”
আরেক ছাত্রী মরিয়ম বলে,“রহিমা ম্যাডাম আমাদের সবার কাছ থেকে ৬০ টাকা নিয়েছে।”
একই বিদ্যালয়ের আরও দুই শিক্ষার্থী জানায়, ৯ মে পরীক্ষার শেষে তাদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে অন্যদের টাকা এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি। শিক্ষকেরা খুচরা টাকার সংকট দেখিয়ে পরে টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও দাবি করে তারা।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন,“সরকার বছরের পর বছর ফ্রি শিক্ষার কথা বলছে। অথচ স্কুলে গেলেই বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দিতে হয়। গরিব মানুষের সন্তানদের কাছ থেকে পরীক্ষার নামে টাকা নেওয়া অমানবিক।”
আরেক অভিভাবক বলেন,“আমরা নিয়ম জানি না। শিক্ষকরা টাকা চাইলে বাধ্য হয়েই দিতে হয়। না দিলে আবার বাচ্চাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হবে কিনা সেই ভয়ে থাকি।”
এলাকার সচেতন মহল বলছে, সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে অর্থ আদায় হয়, তাহলে তা শুধু অনিয়ম নয়—এটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার পরিচয়।
অভিযোগের বিষয়ে ২১ নম্বর কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামাল আহমেদ বলেন,“ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে না নিলে আমার ব্যক্তিগত পকেট থেকে দিতে হবে। পরীক্ষার খরচ তো স্লিপের টাকা থেকে হওয়ার কথা, কিন্তু সেই টাকা পাওয়া যায় না।”
অন্যদিকে, ৫৯ নম্বর ইকড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশরাফ বলেন,“প্রথমে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা ছিল, যা আমরা পরবর্তীতে আর নিইনি।”


এ বিষয়ে উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সরোয়ার হোসেন বলেন,“সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষার জন্য কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ফি নেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের অধিদপ্তর থেকে পরীক্ষার ফি বাবদ টাকা নেওয়ার জন্য কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে স্লিপের টাকা থেকে তারা খরচ করতে পারবে। স্লিপের বাজেট হিসেবে প্রথমে ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ এসেছে। পরবর্তীতে এই টাকা বাড়ানো হবে।”
তিনি আরও বলেন,“তারা যদি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

Facebook Comments Box
Share:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *