রাইতের মেঘে কৃষকের স্বপ্ন পানিতে তলিয়ে গেছে

তিমির বনিক, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: এক রাইতের মেঘে (বৃষ্টিতে) সব আশা-ভরসা ভাসাইয়া লইয়া গেছে। বাল-বাইচ্চারে লইয়া হারা বছর কিতা খাইমু? চুক্তি বাগি আনা জমিনের মালিকরে কিতা দিমু এই চিন্তায় রাইত-দিন চউকের পানি অনবরত পড়ের।’ স্থানীয় ভাষায় এই কথাগুলো বলেছিলেন রাজনগরের কাউয়াদীঘি হাওরপারের বাসিন্দা নিদনপুর গ্রামের কৃষক শহর উল্লাহ (৪০)।

কাউয়াদীঘি হাওরপারের এই কৃষক জানান, চুক্তি বাগি (ফসল যাই হোক এক ফসলের জন্য বিঘাপ্রতি জমির মালিককে তিন-চার মণ দেওয়ার চুক্তি) ১৫ কেয়ার (বিঘা) বোরো জমি এনে ধার-দেনা করে হাইব্রিড জাতের ধান ফলিয়ে ছিলেন। অন্য বছরের তুলনায় এ বছর ফলন ও ভালো হয়েছিল। কিন্তু মাত্র দুই কেয়ার জমিনের ফসল কেটে ৪৫-৫০ মণ ঘরে তুলতে পেরেছিলেন। পরশু দিন রাতের বৃষ্টিতে তার সব পাকা ফসল বুক সমান পানিতে তলিয়ে স্বপ্ন গুলো চুরমার করে দিয়ে যায়।

তার মতো এই এলাকার মেদিনীমহল, নিদনপুর, ধুলিজোড়া, জামুয়া, কেওলাসহ আশপাশের গ্রামের কৃষকদের ৮ থেকে ১০ হাজার জমির ফসল তলিয়ে গেছে। ঋণের টাকায় আবাদ করে বিপাকে পড়েছেন তিনি। ৩৫-৪০ হাজার টাকা ঋণ কেমনে পরিশোধ করবেন এ চিন্তায় পড়েছেন।

এ হাওরের উলাউলি, মাটিগোড়া, ফাটাশিঙা বিল এলাকায় চুক্তিবর্গা নিয়ে প্রায় ৫০ বিঘা জমি চাষ করেছিলেন ফতেপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর গ্রামের সুজন মিয়া। হাওরের নিচু এলাকায় তার জমি হওয়ায় সেসব জমিতে আরও বেশি পানি থৈ থৈ করছে। তিনি বলেন, ‘পাকা ধান থাকলেও শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটতে পারছিলেন না। ৫-৬ কেয়ার ধান কাটার পর এক রাতের বৃষ্টিতে আগামীর স্বপ্ন ডুবে গেছে। যদি ২-৩ দিনের মধ্যে পানি নেমে যায় তবুও কিছু ধান কেটে বাড়িতে আনা যাবে। এতে ২-৪ মাসের খাওয়ার ধান পাওয়া যেতে পারে।’

হাওরপারের কৃষকরা জানান, মনু প্রকল্প এলাকার কাশিমপুর পাম্প হাউসের ৮টি মেশিনে প্রতিদিন লাগাতার সেচ দিলে ২-৩ দিনের মধ্যে হাওরের পানি কমে যাবে। ফলে বেশ কিছু জমির ফসল কাটা যেতে পারে। এর বেশি দিন পানিতে ধান জমে থাকলে পচে যাবে।

ফতেপুর ইউনিয়নের মোকামবাজার এলাকার কৃষক শামসুউদ্দিন জানান, দীর্ঘদিন ধরে বুরবুরিয়া বিলসহ বিভিন্ন নালা-খাল খনন না করায় ভরে গেছে। এতে স্বল্পমাত্রার বৃষ্টিতে হাওরের উঁচু এলাকার জমিতেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এছাড়া বৃষ্টির সাথে চারিদিকের পানি নামতে থাকে কাউয়াদীঘি হাওরে। পাম্প হাউস সেচ দিলেও প্রতিদিন আখালিয়া, উদনাছড়াসহ বিভিন্ন খাল-বিল দিয়ে পানি আসায় সেচ দিলেও তিল তিল করে কমছে পানি। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে সব সময় পাম্প হাউস সচল থাকে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, গত দু’দিন ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট না থাকায় নিরবচ্ছিন্নভাবে কাশিমপুর পাম্পগুলো সচল রয়েছে। বর্তমানে মনু প্রকল্প এলাকায় যে পরিমাণ পানির লেভেল থাকার কথা তার চেয়ে কিছুটা বেশি রয়েছে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রের বরাতে জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলায় ৬২ হাজার ৪শ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। তার মাঝে হাওর এলাকায় ৮২.৫ ভাগ, ৩০ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। নন হাওর এলাকার আট হাজার ৬০ হেক্টর জমির ফসল কাটা হয়েছে। এ হার ২৩ শতাংশ। কর্তনের গড় হার ৪৯ শতাংশ।

জেলার বিভিন্ন হাওর প্লাবিত হয়ে এক হাজার ১৫০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৯০ হেক্টর জমি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৮ হাজার ৫০। তবে কাউয়াদীঘি, হাকালুকি, হাইল হাওর, কড়াইয়া, বড়হাওর, পূবের হাওর এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানিয়েছেন, পানিতে ডুবে ও শিলাবৃষ্টিতে ২-৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান, বোরো আবাদ এলাকা ঘুরে এবং সাতটি উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

Facebook Comments Box
Share: