৩ বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা, ভাতা খেলেন ১৭ বছর

টপ নিউজ বাংলাদেশ
Share this news with friends:

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বয়স ছিল মাত্র ৩ বছর। অথচ ভুয়া জন্মসনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করে ২০০৪ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের শিশু মুক্তিযোদ্ধা খ্যাত বিমল চন্দ্র মজুমদার।

এ ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর তিনি নিজেই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির কাছে লিখিতভাবে জানান তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন এবং ওই তালিকা থেকে তার নাম বাদ দেয়ার জন্য আবেদন জানান।

Advertisements

গত ১৭ বছর ধরে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতাসহ সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছিলেন। ১২ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউল হক মীর স্বাক্ষরিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে প্রেরিত প্রতিবেদনে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বিমল চন্দ্র মজুমদারকে তালিকা থেকে বাদ দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, বিমল চন্দ্র মজুমদার ২০০৪ সালে ভুয়া জন্মসনদ দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। তারপর দীর্ঘ ১৭ বছর রাষ্ট্রীয় সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন তিনি। তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২০১৬ সালে তার ছেলে সীমান্ত চন্দ্র মজুমদারকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে ভর্তি করান। সে এখনও ওই মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত আছে। অথচ এখন বিমল নিজেই বীর মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়ার আবেদন করেছেন।

উপজেলা সমাজসেবা অফিস সূত্র জানায়, বিমল চন্দ্র মজুমদার ২০০৪ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেলেও তার মুক্তিযোদ্ধা ভাতাপ্রাপ্তি শুরু হয় ২০১৪ সালের জুলাই মাস থেকে।

Advertisements

সোনালী ব্যাংক বসুরহাট শাখা সূত্রে জানা যায়, বিমল চন্দ্র মজুমদারের মুক্তিযোদ্ধা হিসাব নম্বরে মোট চার লাখ ৭৫ হাজার ৯৬২ টাকা জমা হয়েছে। সেখান থেকে দুই লাখ ২৮ হাজার ৫২৪ টাকা উত্তোলন করা হয়। বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের ওই হিসাবে দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৩৮ টাকা জমা আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিমল চন্দ্র মজুমদারের প্রকৃত জন্মতারিখ ১৯৬৮ সালের ১ জানুয়ারি। ভুয়া জন্মসনদ দিয়ে ১৯৯৯ সালে কোম্পানীগঞ্জের বামনী ডিগ্রি কলেজে সাচিবিক বিদ্যা বিষয়ে প্রদর্শক পদে নিয়োগ পান। ১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারি ভুয়া জন্মসনদ ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে তিনি ২০০৪ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্ত হয়েছিলেন।

উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. রাসেল আহমেদ জানান, বিমল চন্দ্র মজুমদারের বীর মুক্তিযোদ্ধার বিষয়টি সন্দেহ হলে ২০১৯ সালে সোনালী ব্যাংক বসুরহাট শাখাকে তার ভাতা উত্তোলন স্থগিত রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়। এখন তার ওই হিসাব নম্বরে দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৩৮ টাকা জমা আছে। বিমলের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উত্তোলনকৃত টাকা উদ্ধারের বিষয়ে সরকারি নির্দেশ মোতাবেক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Advertisements

বিমল চন্দ্র মজুমদার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, দুষ্ট লোকের প্ররোচনায় আমি মিথ্যা তথ্য ও ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলাম। বর্তমানে আমি সেই তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে আবেদনও করেছি।

উত্তোলনকৃত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ফেরত দেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথমে এড়িয়ে গেলেও পরে উত্তোলনকৃত ভাতার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেবেন বলে জানান।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি (মুজিব বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার) স্থানীয় সংসদ সদস্য (সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের) ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত খান বলেন, বিমল চন্দ্র মজুমদার কখনই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তখনকার সময়ে তাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছিল। এখনো কোম্পানীগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেছেন।

Advertisements

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউল হক মীর বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সরকারি নির্দেশনা পেয়ে গেজেটপ্রাপ্ত সন্দেহভাজন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই কমিটিতে ডাকা হয়। উপজেলার চরহাজারী ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের মোহন্ত ডাক্তার বাড়ির মৃত পরেশ চন্দ্র মজুমদারের ছেলে বিমল চন্দ্র মজুমদার একাত্তর সালের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না বলে লিখিত স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

Drop your comments: