এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ ভয়াবহ বন্যায় বাঁশখালীতে প্রায় ১১ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নতুন ঘর পাচ্ছে মাত্র ১০০ পরিবার। আগামীকাল ৯ আগস্ট(রোববার) প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরকালে নির্বাচিত এসব পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেওয়া হবে। সরকারের এ উদ্যোগে ১০০ পরিবার নতুন ঠিকানা পেলেও বাকি হাজার হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্ন। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ঘরের বাসিন্দাদের একটি অংশ এখনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি, অস্থায়ী আশ্রয় কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের অবশিষ্টাংশে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোর মধ্যে বাঁশখালী অন্যতম। টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। এতে বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার জেলে সম্প্রদায় এবং মাটির ঘরে বসবাসকারী দরিদ্র পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে বাঁশখালীতে প্রায় ১১ হাজার ঘরবাড়ি ভেঙে বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কয়েক হাজার ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নতুন ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। বাঁশখালী পৌরসভা ও উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন থেকে যাচাই-বাছাই করে ১০০টি পরিবারকে প্রথম ধাপে নতুন ঘর দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রতিটি ঘরের দৈর্ঘ্য ১৮ ফুট ও প্রস্থ ১২ ফুট। এতে থাকবে দুটি কক্ষ। পাশাপাশি ৫ ফুট বাই ৫ ফুটের একটি সংযুক্ত শৌচাগার নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ঘরগুলোতে আরসিসি পিলার, কাঠ ও টিন ব্যবহার করা হচ্ছে।
রোববার প্রধানমন্ত্রী প্রথমে স্বামীহারা এক নারীর হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেবেন। সন্তানদের নিয়ে বসবাসকারী ওই নারীর হাতে চাবি হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে প্রতীকীভাবে ১০০ পরিবারের মধ্যে ঘর হস্তান্তর কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রশ্ন হাজারো পরিবারের পুনর্বাসন নিয়েঃ
১০০ পরিবারকে ঘর দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিপুলসংখ্যক পরিবার এখনো পুনর্বাসনের বাইরে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যেসব পরিবারের ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে, তাদের অনেকেই এখনো নতুন করে ঘর নির্মাণের সামর্থ্য হারিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের একটি অংশ ঘর মেরামতের জন্য সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়া নয়, ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে ধাপে ধাপে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে বিধবা, স্বামীহারা, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক, জেলে ও হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির পাশাপাশি বাঁশখালীর কৃষি, মৎস্য, রাস্তাঘাট, বেড়িবাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামোতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনকে শুধু আবাসন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবিকা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুনর্বাসন কর্মসূচি কতদূর এগোবে?
১০০ পরিবারকে ঘর দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের পুনর্বাসন কার্যক্রমের প্রথম ধাপ শুরু হলেও বাকি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রত্যাশা, প্রথম ধাপের পর দ্রুত দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে আরও পরিবারকে নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলোর মেরামতের জন্য ঢেউটিন, নগদ অর্থ ও নির্মাণসামগ্রী দেওয়ারও দাবি রয়েছে।
এদিকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৫ জন প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিকে আর্থিক সহায়তার চেক দেওয়া হবে। পাশাপাশি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ২০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে।
বাঁশখালীর কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় যাবেন। সেখান থেকে হাটহাজারীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আর্থিক সহায়তা প্রদান করবেন। সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম শহরে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা সভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরের অংশ হিসাবে বাঁশখালী সফরকে সামনে রেখে বাঁশখালীর বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন এলাকায় দুটি হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। শনিবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এসব তথ্য জানান। এর আগে জেলা প্রশাসক অনুষ্ঠানস্থল, হেলিপ্যাড, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নির্মাণাধীন ঘরগুলো পরিদর্শন করেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার মধ্যে বাঁশখালী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে জেলে সম্প্রদায়সহ মাটির ঘরে বসবাসকারী অনেক পরিবারের ঘর সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। এসব পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নতুন ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে ১০০ পরিবারকে নতুন ঘর দেওয়ার উদ্যোগ বন্যাদুর্গতদের জন্য আশার আলো তৈরি করেছে। এখন বাঁশখালীর মানুষের অপেক্ষা—বন্যায় ঘর হারানো বাকি হাজার হাজার পরিবার কবে পাবে পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা?
