ঈদের ছুটিতে চায়ের রাজধানীতে পর্যটকদের ভিড়

তিমির বনিক, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: ঈদুল ফিতরের টানা ছুটির তৃতীয় দিনেও চায়ের রাজধানী খ্যাত মৌলভীবাজারে ঘুরে বেড়ানো পর্যটকদের মাঝে ছিলো এক অন্যরকম আনন্দ। অনেকেই ব্যস্ত নগর জীবনের কোলাহল ছেড়ে প্রকৃতির অপরুপ লীলাভূমির খুঁজে ছুটে এসেছেন। আবার কেউ চার দেয়ালের বন্ধিদশা থেকে বেরিয়ে আসেন প্রকৃতির ভেতর মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে একটু দূষনমুক্ত নি:শ্বাস নিতে। প্রকৃতির চির চেনা সবুজের ভেতর কিছু সময় কাটিয়ে অনেকেই ফিরে পেয়েছেন মনোমুগ্ধকর এক নির্মল প্রশান্তি।

ব্যস্ত নগরীর জীবনের কোলাহল থেকে দূরে নীরব প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে আছে ভিন্ন এক আনন্দ। যতদূর চোখ যায়, দেখা মেলে সবুজে মোড়ানো অপরূপ দৃশ্য। প্রকৃতির ভেতর লুকিয়ে থাকা অপরূপ দৃশ্য নিজ চোখে অবলোকন করতে জেলার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পরিবার পরিজন নিয়ে চষে বেড়ান পর্যটকরা। যে দিকে তাকানো যায় সে দিকে শুধু সবুজে ঘেরা প্রকৃতির দৃষ্টি নন্দন সমারোহ। পর্যটকরা বলছেন এ সব দৃশ্য নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না প্রকৃতিযে কত সুন্দর। পর্যটকরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হাতে হাত রেখে পরিবার আর প্রিয়জনদের নিয়ে ঈদের ছুটি উপভোগ করতে পেরে ভীষন খুশি।

সবচেয়ে বেশী পর্যটকদের ভিড় লেগেছে প্রকৃতির নানা রুপে সজ্জিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বদ্ধভূমি এলাকা, মাধবপুর লেইক, চা কন্যা মাধাবকুন্ড জলপ্রপাত, চা বাগান হাইল হাওর, বাইক্কার বিল, চা কন্যার ভাস্কর্য, রমেশ রাম গৌড়ের আবিষ্কৃত সাত রঙের চা, বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র, রাবার বাগান, গোলটিলা, হাজমটিলা, সীতেশ বাবুর বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্র, খাসিয়া পুঞ্জি, মনিপুরী সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্প, গারোপল্লী, ভাড়াউড়া লেক, সীমান্তবর্তী ধলই চা-বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, শংকর টিলাসহ অসংখ্য পর্যটন স্পট।

নিজেদের মতো করে ঈদের দিনকে উপভোগ করতে রাজধানী ছাড়াও আশেপাশে জেলা থেকে মোটরসাইকেল, সিএনজি, মাইক্রোবাস প্রাইভেটকারে করে যুবক তরুন-তরুনী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে ভিড় করেন দর্শনীয় স্থানগুলোতে।

ঢাকা চট্রগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা একাধিক পর্যটকরা জানান, প্রকৃতির অপরুপ দৃশ্য তাদের মুগ্ধ করেছে। আবহাওয়া ছিল ভালো। হালকা শীতের ভাব ছিল। কেউ বলছেন চার দেয়ালের বন্ধিদশা থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে যায়। দূষনমুক্ত নি:শ্বাস নিতে তাদের খুববেশী আনন্দিত। সবুজের ভেতর কিছু সময় কাটিয়ে অনেকটা প্রশান্তি পেঢেছেন।

কর্মজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও ঈদের আনন্দ ও ছুটিতে সবার মাঝে ছিল বাঁধা ভাঙ্গা উচ্ছাস। কেউ ব্যস্ত ছিলেন সেলফিতে, কেউ গল্পে আড্ডায়, কেউ বা দল বেধে পরিবার পরিজন নিয়ে একান্তে সময় কাটিয়েছেন।

ঈদের বিকেল ও পরবর্তী দুই দিন যানজটের কারণে দর্শনার্থীরা পড়েন ভোগান্তিতে। এমন দৃশ্য দেখা যায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভানুগাছ সড়কের বধ্যভূমি, বিটিআরআই চা বাগান ও লাউয়াছড়া সড়ক এলাকায়। দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে অনেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে নেমে যান। প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা হেঁটে তাঁরা বিটিআরআই চা বাগান এলাকা ঘুরে দেখেন। আবার চা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণধীন টি রিসোর্ট এর সামনে থেকে মানুষের ঢল থাকায় যানজটে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হচ্ছে। ফলে সব ধরনের দর্শনার্থীরা পায়ে হেঁটে যেতে বাধ্য হচ্ছেন বিভিন্ন স্পটে।

এদিকে জেলার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে প্রায় পুল বুকিং থাকায় পর্যটকের উপস্থিতি লক্ষণীয়। রমজানের আগ থেকেই পর্যটক না থাকায় পরিবহন ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায় স্থবিরতা নেমে আসে। তবে ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় প্রতিষ্ঠানগুলো সাজানো হয়। অপরদিকে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে প্রায় সব হোটেল-রিসোর্টে রাখা হয়েছে বিশেষ অফার ও সুযোগ-সুবিধা।

পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো: সেলিম আহমেদ জানান, জেলার শতাধিক পর্যটন স্পটের মধ্যে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জই পর্যটকদের প্রথম পছন্দ। এ দুই উপজেলাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেড় শতাধিক রিসোর্ট, ইকো কটেজ ও হোটেল-মোটেল। তিনি বলেন, ‘ঈদের লম্বা ছুটিতে শতভাগ বুকিং হয়েছে।’ শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাধানগর এলাকায় অবস্থিত প্রায় অর্ধশত রিসোর্ট ও কটেজে ২২ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ছুটি শেষে আবারও নিজ নিজ কর্মস্থলে যেতে হবে জেনেও প্রায় শতভাগ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। শহরের হোটেলগুলোতে পর্যটকের আগমনে সেগুলোও পূর্ণ হয়ে গেছে।

বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফের স্বত্বাধিকারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, “আসন্ন পবিত্র ঈদকে সামনে রেখে শ্রীমঙ্গলে পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে আমরা বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। ঈদের ছুটিতে যারা শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে এসেছেন, তাদের জন্য মূলত স্থানীয় ও আদিবাসী খাবারের বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে, যাতে তারা এ অঞ্চলের স্বাদ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।”

পাঁচ তারকা হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান বলেন, ঈদে বিদেশি পর্যটক তুলনামূলক কম এলেও দেশীয় পর্যটকের চাপ বেশি। এবারও আমাদের ৭/৮ দিনের জন্য বুকিং শত ভাগ হয়েছে।

ট্যুারিস্ট পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর পলাশ চন্দ্র সরকার জানান, ঈদ উপলক্ষে পর্যটন স্থান গুলোতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যটন পুলিশ সার্বক্ষণিক টহল জোড়দার করেছে। পাশাপাশি সাদা পোষাকে পুলিশের কয়েকটি টিম টহল দিচ্ছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী অফিসার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহিবুল্লাহ আকন বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে ইতিমধ্যে আমরা সকল হোটেল ও রিসোর্ট মালিকদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাদেরকে বলেছি সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোবাইল নাম্বার এবং ফায়ার সার্ভিসের নাম্বার সংগ্রহে রাখার জন্য। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে যেন তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। তবে আশা করছি আমরা শান্তি শৃঙ্খলাভাবে ঈদ উৎসব উদযাপন করতে পারব।’

প্রকৃতির টানে ঈদ সহ সারা বছর বার বার ছুটে আসেন পর্যটকরা। পর্যটন স্থানগুলোকে আরও আকর্ষনীয় করে তুলতে পারলে দেশী-বিদেশী পর্যটককের আগমন আরো ও বৃদ্ধি পাবে। এতে করে এ শিল্প যেমন বিকশিত হবে তেমনি সরকারের রাজস্ব আদায়েও বৃদ্ধি পাবে।

Facebook Comments Box
Share: