শীতজনিত রোগে চট্টগ্রাম মেডিকেলে প্রতিবছর হাজার শিশুর মৃত্যু

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ জ্বরে আক্রান্ত শিশুদের অনেক ক্ষেত্রে ক্লোফেনাকজাতীয় সাপোজিটরি ও ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারের কারণে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগে গত তিন বছরে চিকিৎসা নিতে এসে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৪৭৫ জন শিশু।

এ মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে শীতজনিত নানা রোগ। নতুন বছরেও এই ভয়াবহ চিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। চলতি শীত মৌসুমে ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়া, ব্রংকিওলাইটিস ও শীতজনিত অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য শিশু হাসপাতালের শয্যায় কাতরাচ্ছে। শুধু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নয়, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালেও প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ জন শিশু শীতজনিত রোগে চিকিৎসা নিচ্ছে। এদিকে জ্বরে আক্রান্ত শিশুদের অনেক ক্ষেত্রে ক্লোফেনাকজাতীয় সাপোজিটরি ও ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারের কারণে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। হাসপাতাল সূত্রে চমেকের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৮ ও ৯ নম্বর শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের তিনটি ওয়ার্ডে ২০২৫ সালে চিকিৎসা নিয়েছে ২৫ হাজার ৭৬০ জন শিশু। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৯২০ জনের। একই বিভাগের তিনটি ইউনিটে শুধু অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর—এই তিন মাসে চিকিৎসা নিয়েছে ৭ হাজার ৬৮৩ জন শিশু, মারা গেছে ১৮৫ জন। শুধু ডিসেম্বর মাসে— ডায়রিয়ায় আক্রান্ত : ১২৮ জন, ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়া : ৩৭৪ জন, থ্যালাসেমিয়া : ৬৬ জন। ওই মাসে মোট ৬০ জন শিশু মারা গেছে। ২০২৪ সালে জেনারেল পেডিয়াট্রিকে চিকিৎসা নিয়েছে ২২ হাজার ১১৮ জন শিশু, মারা গেছে ৭২৬ জন।

এর মধ্যে— ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়া : ১৫৪ জন,  এনসেফালাইটিস : ৯৪ জন। একই সময়ে পিআইসিইউতে ভর্তি ছিল ৭৯২ জন শিশু, মৃত্যু হয়েছে ২৫৫ জনের। ২০২৩ সালে তিনটি ইউনিটে চিকিৎসা নিয়েছে ২৩ হাজার ৭২৮ জন শিশু, মারা গেছে ৮২৯ জন। ওই বছরে— ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়া : ১৯৪ জন, জন্মগত হৃদরোগ : ৮৬ জন, গুরুতর সেপসিস ও শক : ৮১ জন, এনসেফালাইটিস : ১২৩ জন, ডেঙ্গু : ১৪ জন। পিআইসিইউতে চিকিৎসা নিয়েছে ৫৩৩ জন, মৃত্যু হয়েছে ২১৬ জনের। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও নেফ্রোলজিস্ট ডা. মোহাম্মদ মারুফুল কাদের বলেন, “শীতকালে রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। জ্বর হলে শিশুকে কেবল প্যারাসিটামল দেওয়া যাবে। কোনো অবস্থাতেই ক্লোফেনাকজাতীয় সাপোজিটরি বা ব্যথানাশক দেওয়া যাবে না। এতে কিডনি বিকল হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “শিশু দুধ না খেলে, বমি করলে, শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বা বুক ও গলার নিচে ঢেবে গেলে দ্রুত হাসপাতালে আনতে হবে। দেরি হলে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতা দেখা দেয়।” শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. ধীমান চৌধুরী জানান, শীতজনিত সংক্রমণের পাশাপাশি ডাস্ট ও কোল্ড এলার্জি বাড়ছে। ভাইরাসজনিত ব্রংকিওলাইটিস ও ইনফ্লুয়েঞ্জার ঝুঁকি এড়াতে মাস্ক ব্যবহার, হাত ধোয়া ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। হাসপাতালের পিআইসিইউতে রয়েছে ২০টি সিট। গ্লাসকো কমা স্কেলে (GCS) শিশুর চেতনার মাত্রা ৮-এর নিচে নামলে পিআইসিইউতে নেওয়া হয়। শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন,।“শীত ও ঋতু পরিবর্তনের সময় শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি দ্বিগুণ হয়ে যায়। শিশুদের ঠান্ডা পানি ব্যবহার ও খালি পায়ে হাঁটা থেকে বিরত রাখতে হবে। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে রুটিন টিকাদান অত্যন্ত জরুরি।” কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে আসা এক রোগীর অভিভাবক জানালেন, তাঁর ৪৩ দিনের কন্যাশিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অক্সিজেন সাপোর্টে রয়েছে। আরেকজন জানালেন তার সন্তানকে দেরিতে হাসপাতালে আনার কারণে পিআইসিইউতে নিতে হয়েছে। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগে প্রতিদিন ২০০–২৫০ জন শিশু শীতজনিত রোগে চিকিৎসা নিচ্ছে। মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে ও প্রতিদিন ১৫০–২০০ জন শিশু বহির্বিভাগে আসছে। চিকিৎসক ও নার্সদের ভাষ্য, স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব ও দেরিতে হাসপাতালে আসাই শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

Facebook Comments Box
Share:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *